কানের সমস্যার কিছু সমাধান
কান দিয়ে অনেকেরই পানি, পুঁজ পড়ে থাকে কিংবা কান পাকা রোগ হয়ে থাকে। এতে করে পোহাতে হয় নানারকম দুর্ভোগ এবং অস্থিরতা।
কান পাকা রোগটির কারণ কী?
বাংলাদেশের মতো অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই রোগটি হয়ে থাকে। তার কারণ-
দারিদ্র্যতা, অপুষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাব
ইত্যাদি।
কান পাকা রোগের লক্ষণগুলো একটু বলবেন কী?
কান দিয়ে পানি/ পুঁজ পড়া। ২) কানে তুলনামূলকভাবে কম শুনা। ৩) মাথা ঘোরানো
(শণর্রধথম)। ৪) কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করা ইত্যাদি।
কান পাকা রোগ কাদের বেশি হয়?
এই রোগটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে এবং নারী-পুরুষ উভয়ই আক্রান্ত হতে পারে।
তবে শহরবাসীর তুলনায় গ্রামের মানুষের এই রোগটি বেশি হয়। অনেক সময় দেখা যায়
গ্রামের মানুষের ক্ষেত্রে কানে কম শোনার এই রোগটি একটি প্রধান কারণ। কান
দিয়ে পানি/পুঁজ পড়া রোগটি সাধারণত শৈশবেই শুরু হয়। আর তাই কম বয়সের
ছেলেমেয়েদের মাঝেই এই রোগ বেশি দেখা যায়।
শিশুদের কান দিয়ে পানি/পুঁজ আসার কারণ কী?
আগেই বলেছি আমাদের সবারই ইউস্টেশিয়ান টিউব নামক একটা টিউব আছে যার এক মাথা
থাকে মধ্য কর্ণে এবং আরেক মাথা থাকে নাকের পেছনে ন্যাজোফেরিংস নামক
স্থানে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই টিউবটা থাকে খাটো, প্রশস্ত এবং একদম
সোজাসুজি । ফলে মা বোনরা যখন শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ান অথবা বোতলে দুধ/
পানি খাওয়ান তখন যদি শিশুর মাথার দিকটা একটু উঁচু না করে ফ্লাট অবস্থায়
খাওয়ান তখন এই দুধ/পানি কিছুটা হলেও মধ্য কর্ণে চলে যায় এই টিউব দিয়ে।
পরবর্তীতে এই দুধ/ পানি মধ্য কর্ণে ইনফেকশন সৃষ্টি করে কান পাকা রোগ।
এছাড়াও বাচ্চাদের ঘন ঘন ঠান্ডা লাগে, আপার রেসপিরেটরী ট্রাক্ট ইনফেকশন বেশি
হয়, টনসিলে ইনফেকশন হয়, সাইনোসাইটিস হয়, এডিনয়েড বেশ বড় হয়ে ইউস্টেশিয়ান
টিউবের নরমাল কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়। এসব কারণে প্রথম দিকে হঠাৎ করে কানে
প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়, জ্বর থাকে,এরপর কানের পর্দা ফুটো হয়ে পানি বেরিয়ে
আসে।ঐ সময় ঠিকমতো এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেলে পর্দার ছিদ্রটি স্থায়ী হয়ে
যায় এবং পরবর্তীতে কানে ইনফেকশন হবার কারণে কান দিয়ে পানি/পুঁজ আসে।
আমি একজন কান পাকা রোগী,মাঝে মাঝে আমার কান দিয়ে পানি/ পুঁজ পড়ে ঐ সময় ঔষধ
খাওয়ার পর এবং কানে ড্রপ দেওয়ার পর কান একদম শুকিয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ করে
আবার যেকোনো দিন কান দিয়ে পানি/পুঁজ আসতে শুরু করে।এর কি কোনো স্থায়ী
সমাধান নেই? হতাশ হবেন না,ইনশাআল্লাহ্ আপনি ভালো হয়ে যাবেন। তবে এক্ষেত্রে
আপনাকে একজন নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে হবে। আপনি যেমনটি
বলেছেন তাতে মনে হয় ঔষধ সেবনের পর এবং কানের ড্রপ দেওয়ার পর যদি আপনার কান
একেবারে শুকিয়ে যায় এবং এইভাবে যদি কমপক্ষে তিন সপ্তাহ কান শুকনো থাকে তবে
সেক্ষেত্রে আপনি একজন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন-এর পরামর্শ নিয়ে, ওনার
মাধ্যমে সার্জারী করে বা মাইরিংগোপ্লাস্টি করে স্থায়ী সমাধানে যেতে পারেন।
তবে অপারেশনের আগে আপনার কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। যেমন- (১)
অডিওলোজিক্যাল টেস্ট (হিয়ারিংটেস্ট) (২) ঙ-রটহ র্ট্রমধঢ (মাস্টয়েড এর
এক্সরে) (৩) কানের পানি/ পুঁজের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট (যদি পানি/
পুঁজ থাকে)। মাইরিংগোপ্লাস্টি হচ্ছে কানের ফুটো পর্দা জোড়া লাগিয়ে দেওয়া,
এর ফলে কান দিয়ে আর পানি/পুঁজ পড়বে না।কান পাকা রোগ থেকে কি মারাত্মক
জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে? তাহলে কি ধরনের মারাত্মক রোগ হতে পারে বলবেন কী?
কান পাকা রোগটি মূলত দুই ধরনের-
(১) সেফ টাইপ (টিউবোটিমপেনিক টাইপ), সাধারণত এটাতে তেমন কোনো জটিলতা দেখা যায় না।
(২) আনসেফ টাইপ (এটিকোএন্ট্রাল টাইপ), এই ধরনের কান পাকা রোগ থেকে
মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে যা কিনা প্রাণনাশের হুমকিস্বরূপ। যেমন-
ব্রেইনএবসেস, ম্যানিনজাইটিস, এনসেফালাইটিস, ফেসিয়াল প্যারালাইসিস ইত্যাদি।
যাদের এখনো কান পাকা রোগ হয়নি এবং যারা এই রোগে ভুগছেন তাদের জন্য আপনার
পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ বা উপদেশ আছে কী? সবার জন্য একই কথা- অযথা কান
খোঁচাবেন না, ম্যাচের কাঠি, মুরগির পাখনা, ক্লিপ, নখ ইত্যাদি দিয়ে কান
চুলকাবেন না। রাস্তা-ঘাটে যেখানে সেখানে কান পরিষ্কার করানোর জন্য বসে
পড়বেন না। সর্দি, কাশি, ঠাণ্ডা, জ্বর, নাক বন্ধ, গলা ব্যথা হলে অবশ্যই
চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলবেন।
যারা কান পাকা রোগে ভুগছেন তাদের জন্য পরামর্শ-
(১) গোছলের সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনোভাবেই কানে পানি ঢুকতে না
পারে। প্রয়োজনে ইয়ারপ্লাগ দিয়ে গোসল করবেন। তা না হলে তুলা তেলে ভিজিয়ে
অতিরিক্ত তেল চিপড়িয়ে ফেলে দিয়ে তুলা কানে দিয়ে গোছল করবেন। (২) পুকুরে/
নদীতে ডুব দিয়ে গোসল করবেন না। (৩) ফ্রিজের পানি, আইসক্রিম, ঠাণ্ডা পানীয়
ইত্যাদি পরিহার করে চলবেন।
কানের সাধারণ সমস্যা ও প্রতিকার
শোনার সঙ্গে সঙ্গে কথা বলতে শেখা ও দেহের ভারসাম্য রক্ষায় কান
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে কানে সমস্যা দেখা দিলে এর প্রভাব হয়
বহুমুখী।কানের সমস্যা বহু ধরনের হতে পারে। এই যেমন টনসিল বা সাইনাসের
সমস্যার কারণে কারো কারো কানে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। কানের ভেতর হওয়া
প্রদাহের কারণেও কখনো কখনো শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পায় বা লোপ পায়। আবার
অনেকক্ষণ উচ্চগ্রামের আওয়াজ শোনাও কানের জন্য ভীষণ বিপদ ডেকে আনতে পারে
কিংবা বিভিন্ন ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও শ্রবণক্ষমতা চিরতরে বা
কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যেতে পারে। কানে কী ধরনের সমস্যা হয় সে সম্পর্কে
জানতে কানের গঠন সম্পর্কে কিছুটা জানা দরকার।
কান তিনটি অংশে বিভক্ত। বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ ও
অন্তঃকর্ণ। বহিঃকর্ণের অংশগুলো হলো পিনা, বহিঃঅডিটরি মিটাস, টিমপেনিক
পর্দা। মধ্যকর্ণের উল্লেখযোগ্য অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে_ইউস্টেশিয়ান নালি,
কর্ণাস্থি ও ছিদ্রপথ। প্রতিটি অন্তঃকর্ণের আবার দুটি অংশ থাকে। একটি হলো
ইউট্রিকুলাস, আরেকটির নাম স্যাকুলাস। কানের প্রতিটি অংশের কাজ একেবারে
নির্দিষ্ট। এই যেমন অর্গান অব কর্টি শব্দগ্রাহক যন্ত্ররূপে কাজ করে। কানের
তিনটি ছোট হাড় ম্যালিয়াস, ইনকাস ও স্টেপিস শব্দ তরঙ্গ বহিঃকর্ণ থেকে
অন্তঃকর্ণে পাঠায়।
শ্রবণ-প্রক্রিয়া
শব্দ তরঙ্গ পিনায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বহিঃঅডিটরি মিটাসে প্রবেশ করে টিমপেনিক
পর্দাকে আঘাত করলে সেটা কেঁপে ওঠে। কাঁপনে মধ্যকর্ণে অবস্থিত ম্যালিয়াস,
ইনকাস ও স্টেপিস অস্থি তিনটি এমনভাবে আন্দোলিত হয়, ফলে প্রথমে ফেনেস্ট্রা
ওভালিসের পর্দা ও পরে অন্তঃকর্ণের ককলিয়ার পেরিলিম্ফে কাঁপন সৃষ্টি হয়।
পেরিলিম্ফে কাঁপন হলে ককলিয়ার অর্গান অব কর্টির সংবেদী রোম কোষগুলো
উদ্দীপ্ত হয়ে স্নায়ু আবেগের সৃষ্টি করে। এ আবেগ অডিটরি স্নায়ুর মাধ্যমে
মস্তিষ্কের শ্রবণকেন্দ্রে বাহিত হলে মানুষ শুনতে পায়। দেহের ভারসাম্য রক্ষা
করাও কানের অন্যতম একটি কাজ।
কানের সাধারণ সমস্যা ও প্রতিকার
বহিঃকর্ণের প্রদাহ
কানের অন্যতম সাধারণ সমস্যা হলো বহিঃকর্ণে প্রদাহের সৃষ্টি হওয়া। যেকোনো
বয়সেই এ সমস্যার উদ্ভব হতে পারে; তবে বাচ্চাদের এ সমস্যা বেশি হয়। মূলত
কানে ময়লা জমে যাওয়া এবং সেটা নিয়মিত পরিষ্কার না করা হলে বহিঃকর্ণে প্রদাহ
দেখা দেয়। কানের খৈল বা ওয়াক্সের সঙ্গে ধুলাবালি জমেও প্রদাহের সৃষ্টি হতে
পারে। ময়লা পরিষ্কার করার জন্য অনেকেই কটনবাড ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু
কটনবাডে লেগে থাকা ময়লা কানে প্রবেশ করেও কানে ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। এ
জন্য কটনবাডের পরিবর্তে অলিভ অয়েল ব্যবহার করে খৈল নরম করে নেওয়াই শ্রেয়।
এতে কানের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
মধ্যকর্ণের সমস্যা
১. কান পচা রোগ
বিভিন্ন কারণে কান পচা রোগ দেখা দিতে পারে। দুই ধরনের কান পচা রোগ আছে।
একটি তুলনামূলক কম বিপজ্জনক, আরেকটি বেশি বিপজ্জনক। বেশি বিপজ্জনক কান পাকা
রোগ দীর্ঘমেয়াদে আরো বড় সমস্যা করে এবং এ থেকে কখনো কখনো মৃত্যু ঘটাও
অস্বাভাবিক নয়। পানি বা অন্য কিছুর কারণে কানের পর্দা ছিদ্র হয়ে গেলে কান
পচা রোগ দেখা দেয়। এ ছাড়া আমাদের কানের ভেতরে অবস্থিত ছোট ছোট হাড় আছে।
সেগুলো ক্ষয় হয়ে গেলেও এ সমস্যা হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় মধ্যকর্ণে
কলেস্টিটোমার উপস্থিতির কারণে। এটি এক ধরনের ক্ষতিকর অবাঞ্ছিত পাতলা আবরণ,
যা মধ্যকর্ণে সৃষ্টি হয় এবং বাড়তে বাড়তে একসময় মস্তিষ্ক পর্যন্ত বিস্তৃতি
লাভ করে এবং পরবর্তী সময়ে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ঠিক সময়ে
অপারেশনের মাধ্যমে শ্রবণশক্তি ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এ ছাড়া কম বিপজ্জনক কান পচা রোগ (কলেস্টিটোমার উপস্থিতি ব্যতীত) বেশির ভাগ
ক্ষেত্রেই ঔষধের মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব। বাংলাদেশে সব ধরণের কান পচা
রোগের চিকিৎসা করা হয়; দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এ কারণে কানে কম
শুনতে পেলে বা কান দিয়ে দুর্গন্ধ বের হলে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন
হওয়া উচিত, কোনোভাবেই বিলম্ব করা ঠিক নয়।
২. ওটোস্ক্লেরেসিস
ওটোস্ক্লেরেসিস সমস্যাটা কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে
কানের অভ্যন্তরে যে ছোট ছোট হাড় আছে, সেগুলোর জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়, নড়তে
পারে না। ফলে শব্দ আর অন্তঃকর্ণ পর্যন্ত যেতে পারে না, তাই শুনতে সমস্যা
হয়।
অন্তঃকর্ণের সমস্যা
শ্রবণশক্তি হ্রাস ও লোপ পাওয়া
কানের অভ্যন্তরে হিয়ারিং সেল নষ্ট হয়ে গেলে শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি বার্ধক্যজনিত কারণে হয়। কানে সঠিকভাবে শুনতে
পাচ্ছেন কি না তা বোঝার জন্য নিজে নিজেই কয়েকটি পরীক্ষা করতে পারেন। এই
যেমন সবার সঙ্গে টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান দেখতে বসে বারবার টিভির ভলিউম বাড়িয়ে
দিতে বলছেন কি না কিংবা মিটিংয়ে একটু পেছনে বসে বক্তার আওয়াজ আপনার কানে
ঠিকমতো এসে পৌঁছাচ্ছে কি না ইত্যাদি। এভাবে নিজেই কানের অবস্থা সম্পর্কে
সজাগ থাকতে পারবেন। সমস্যা শুরু হবার আগেই বুঝতে পারবেন।
শ্রবণশক্তি হ্রাস পেলে তা পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের হিয়ারিং অ্যাইড (শ্রবণসহায়ক যন্ত্র) সফলভাবে
ব্যবহৃত হচ্ছে।
শব্দদূষণের কারণে শ্রবণবৈকল্য
আমাদের কান একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরের শব্দের প্রতি সংবেদনশীল। শব্দের
মাত্রা গ্রহণের জন্য ককলিয়ার স্ক্যালা মিডিয়ায় বিশেষ স্থান রয়েছে।
স্থানগুলো হচ্ছে উচ্চমাত্রা গ্রহণের জন্য ফেনেস্ট্রা রোটান্ডা-সংলগ্ন অংশ,
মধ্যমমাত্রা গ্রহণের জন্য মাঝামাঝি অংশ এবং নিম্নমাত্রা গ্রহণের জন্য
শীর্ষের কাছাকাছি অংশ।
আমাদের কানের শ্রাব্যতার একটি মাত্রা আছে। অর্থাৎ কেউ যদি ক্রমাগত এ
মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় শব্দ শুনতে থাকে তাহলে একপর্যায়ে আংশিক;
পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে কানের শ্রবণশক্তি লোপ পেতে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকা
বিশ্বকাপে কান ঝালাপালা করে দেওয়া ভুভুজেলার কথা মনে আছে? ভুভুজেলা থেকে
নিঃসৃত শব্দের মাত্রা প্রায় ১২৯ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে বলে বিশ্বকাপের
সময় ভুভুজেলা নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল বিভিন্ন সংগঠন।
ঢাকা শহরে শব্দদূষণের মাত্রা ভয়াবহ। নির্মাণাধীন ভবন, যানবাহনের আওয়াজ,
উচ্চমাত্রায় দোকানে বা মার্কেটে গান বাজানো, সভা-সমিতিতে মাইকের আওয়াজ
ইত্যাদি কারণেই উচ্চমাত্রার শব্দ প্রতিনিয়ত নিঃসৃত হচ্ছে। তবে শব্দদূষণের
কারণে শ্রবণ সমস্যায় বেশি ভোগেন রাস্তায় অবস্থান করা ট্রাফিক পুলিশ,
দোকানদার প্রভৃতি পেশার লোক। ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা শিশুসহ বয়স্ক মানুষও
শব্দদূষণের শিকার হন নিমর্মভাবে। অথচ শব্দদূষণ প্রতিরোধ করা খুব কঠিন কাজ
নয়। এ জন্য নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের মানুষকেও সচেতন করে তোলা
প্রয়োজন।অন্য যেকোনো ইন্দ্রিয়ের মতোই কানের যত্নে আমাদের সবারই অতিরিক্ত
সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত; নতুবা এক মুহূর্তের অসাবধানতার কারণে বরণ করে
নিতে হতে পারে শব্দহীন এক পৃথিবীকে।
যখন ডাক্তার দেখাতে হবে
- কান ব্যথা করছে, কাজ করার আগ্রহ পাচ্ছেন না বা ঈষৎ জ্বর অনুভূত হলে;
- কান দিয়ে পুঁজ বা রক্ত পড়লে;
- কান ভার ভার লাগলে;
- কানে ব্যথা হওয়ার আগে মাথা কিংবা ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছেন এমন ইতিহাস থাকলে;
- কানে কম শুনতে পেলে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতির অবনতি হলে;
- কানে বাইরে থেকে কোনো কিছু প্রবেশ করেছে বলে সন্দেহ হলে।
কান থেকে মাথার সমস্যা
মাথা ঘোরা আসলে কী
যে সকল সাধারণ উপসর্গ নিয়ে রোগীরা ডাক্তারের শরনাপন্ন হয়, মাথাঘোরা তার
মধ্যে একটি অন্যতম উপসর্গ। এই মাথা ঘোরা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। শরীরের
ভারসাম্যহীনতা, পড়ে পাওয়া, মুচ্ছা যাবে বলে মনে হওয়া, মস্তিষ্কে শুন্যতা,
মাথায় ঘুর্নীর মত হওয়া বা পারিপার্শ্বিক পৃথিবী ঘুরছে মনে হওয়া। ইংরেজিতে এ
গুলোকে Dizziness বলে। কেউ যখন বলে যে, সে নিজে ঘুরছে বা পারিপার্শ্বিক
পৃথিবীটা ঘুরছে সেটাকে vertigo বলে। আর এই ধরণের মাথা ঘোরা সাধারণত: কান
তথা অন্তকর্ণের জন্যই হয়ে থাকে।
কান সম্পর্কে দুটি কথা
অন্তকর্ণ এর দুটি অংশ। সামনের অংশকে বলে ককলিয়া যা শ্রবণশক্তি নিয়ন্ত্রণ
করে এবং পিছনের অংশকে বলে ভেস্টিবিউল যা মাথার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
অন্তকর্ণের ঝিল্লির মধ্যে তরল পদার্থ ও অতি সুক্ষ চুল সাদৃশ্য সংবেদনশীল
অঙ্গ থাকে যা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে মাথার অবস্থান সম্পর্কে সংকেত
পাঠায়।
শরীর ও মাথার নিয়ন্ত্রণ
মস্তিষ্কের বিশেষ অংশ যেমন-সেরিবেলাম, সেরিব্রাম, ব্রেইনস্টেম, শরীর ও
মাথার ভারসাম্যতা এবং অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে। চামড়া, মাংসপেশী, হাড় জোড়া ও
চক্ষু, শরীরের অবস্থান সম্পর্কে সংকেত পাঠায় মস্তিষ্কের ঠিকানায়। এগুলোর
কোনোটাতেই স্বাভাবিক কার্য প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত ঘটলে বিভিন্ন তীব্রতায়
মাথাঘোরা রোগ হয়ে থাকে।
উপসর্গ
মস্তিষ্ক, চামড়া, মাংসপেশী, হাড় জোড়া এবং চক্ষুর কোন রোগ হলে শরীরের
ভারসাম্যহীনতা, মস্তিষ্কে শুন্যতা, সংজ্ঞাহীনতা, হাল্কা ঘুনী হয়ে থাকে
সঙ্গে বমি বমি ভাব, বমি, নিস্টেগামস হয়ে থাকতে পারে। অন্তকর্ণের কোন রোগ
হলে মূলত: তীব্র ঘুর্নী হয়ে থাকে সঙ্গে বমি ভাব, বমি, নিস্টেগমাস, ভারসাম্য
হীনতা ও শ্রবন শক্তি কম হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ থাকতে পারে। কিছু অতি সাধারণ
অন্তকর্ণের রোগ যা মাথা ঘোরা সৃষ্টি করে। বিনাইন প্যারঅক্সিস্মাল পজিশনাল
ভাইটাইগো এটি একটি অতি সাধারণ উপসর্গ। হঠাৎ করে মাথা কোনো নির্দিষ্ট
অবস্থানে নিলে মাথা ঘোরা শুরু হয়। সাধারণত শোবার সময় মাথা এদিক ওদিক করলে,
নামাজ পড়লে বা মাথা হেলিয়ে কোন কাজ করলে এই জাতীয় মাথা ঘোরা শুরু হয়।
বয়সজনিত কারণে, মাথায় আঘাত প্রাপ্ত হলে অন্তকর্ণের ঝিল্লির ভিতরের তরল
পদার্থের কিছু পরিবর্তনে এই রোগ হয়। সুখের বিষয় এই যে, এই ধরণের vertigo
বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না এবং ধীরে ধীরে সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর
চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
মিনিয়ার্স ডিজিজ
এই রোগে হঠাৎ করে মাথা ঘোরা শুরু হয়, সাথে বমি ভাব, বমি, ভারসাম্যহীনতা,
শ্রবণ শক্তি সাময়িক কমে যাওয়া, নিস্টেগমাস থাকতে পারে। এর স্থায়ীত্ব হয়
কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক দিন। অন্তকর্ণের ঝিল্লির কারণেই এই রোগ হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঔষধের সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে
অস্ত্রপ্রচার এর প্রয়োজন হতে পারে।
ভেস্টিবিউলার নিউরোনাইটিস
ভাইরাসজনিত কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। নিকট অতিত অথবা বর্তমানে ফ্লু হয়ে
থাকতে পারে। এই রোগের মাথা ঘোরার স্থায়িত্ব সাধারণত বেশি হয়ে থাকে। পূর্ণ
বিশ্রাম সাথে কিছু ঔষধ এর একমাত্র চিকিৎসা।
ল্যাবিরিনাথাইটিস
অন্তঃকর্ণে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া জনিত প্রদাহ হলে এই রোগ হয়। কানে কম শুনতে
পাওয়া, বমি, বমি ভাব, চোখের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, ভারসাম্যহীন থাকা
স্বাভাবিক। অনেক সময় ল্যাবিরিনাথাইটিস-এর আশে পাশে কোন প্রদাহ হলে মাথা
ঘোরা হয়ে থাকে। একে সেরাস ল্যাবিরিনথাইটিস বলে।
একুইস্টিক নিউরোমা
কানের ভেতরের সুড়ঙ্গ পথে ক্যানাল বা সিপি এ্যানজেল-এ এধরনের টিউমার হতে
পারে। তবে এতে শুধু একদিকের শ্রবণ শক্তি কমে যায়। কেবলমাত্র অস্ত্রপ্রচার
এর সাহায্যে এর চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।
অন্যান্য কারণ
কানের আরো কিছু সাধারণ কারণে মাথা ঘোরা রোগ হয়। যেমন মধ্যকর্ণে প্রদাহ,
ইউস্টাশিয়ান টিউবের বন্ধ থাকা বা প্লেনে ভ্রমণে বেরো ট্রমা হওয়া, কানে শক্ত
খৈল কানের পর্দায় চাপ প্রয়োগ করলে মাথা ঘোরা রোগ হতে পারে।
কান ছাড়া অন্য যে সব কারণে মাথা ঘোরা রোগ হতে পারে
১. মস্তিষ্কের বিশেষ জায়গায় রক্তের সঞ্চালন কম হওয়া, রক্তক্ষরণ হওয়া, মস্তিষ্কের টিউমার কিংবা মাল্টিপাল স্ক্রোরোসিস হলে।
২. রক্ত স্বল্পতা, রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে
৩. উপর থেকে নিচে তাকালে
৪. মাইগ্রেন হলে
শেষ কথা
মাথা ঘোরা রোগ অনেক কারণেই হতে পারে। এর জন্য পরিপূর্ণ পরীক্ষা নিরীক্ষা
করার প্রয়োজন, বিশেষ করে তীব্র ঘুর্নী বা vertigo হলে অবশ্যই কোনো নাক, কান
ও গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ
ছাড়া ঔষধ সেবন করা ঠিক হবে না। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হবার আশঙ্কা থেকে
যায়।
কানের পর্দা ছিঁড়ে গেলে
কি কি কারণে কানের পর্দা ছিঁড়ে যায়:
- কোন কিছু দিয়ে কান খোঁচালে
- কোন কিছু ঢুকলে, তা অদক্ষ হাতে বের করার চেষ্টা করলে।
- হঠাৎ বাতাসের চাপজনিত কারণে, যেমন: কানে থাপ্পর দিলে, কোন বিস্ফোরণ ঘটলে, বক্সিং।
- হঠাৎ পানির চাপ, যেমন: পানির নিচে সাঁতার কাটলে, ওয়াটার-পোলো, ডাইভিং।
- মাথায় আঘাত বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে।
উপসর্গসমূহ:
- কানে ব্যথা। প্রথমে তীব্র এবং পরে অল্প ব্যথা।
- কানে কম শুনতে পাওয়া। অল্প ছিঁড়ে গেলে অল্প কম শুনবে, বেশি ছিঁড়ে গেলে বধিরতা বেশি হবে
কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হতে পারে
- মাথা ঘুরতে পারে, যদিও তা স্বল্পকালীন।
- কান পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, কানের পর্দায় ছিদ্র আছে এবং ছিদ্রের চারপাশে এলোমেলো।
- বহিঃকর্ণে রক্ত জমাট থাকতে পারে।
চিকিৎসা:
- কানে কোন ইনফেকশান না হওয়ার জন্য এন্টিবায়োটিক খেতে হবে।
- ব্যথা থাকলে প্যারাসিটামল খেতে হবে।
- কানে কোন পানি দেয়া যাবে না।
- কান খোঁচানো যাবে না।
- কানে কোন ড্রপ দেয়া যাবে না।
- সাঁতার কাটা যাবে না।
- দুই সপ্তাহ পর রক্ত জমা থাকলে তা বের করতে হবে, নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ দিয়ে
- রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে।
- সাধারণত উপরোক্ত চিকিৎসায় রোগী ভাল হয়ে যায়।
- যদি রোগী দেরিতে চিকিৎসার জন্য কান থেকে পুঁজ পড়া বা ইনফেকশন নিয়ে আসে তখন তা কানের বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণের প্রদাহ হিসেবে চিকিৎসা করতে হবে।
- যদি কানের পর্দায় ছিদ্র থেকে যায় তাহলে ২ মাস পর কানের মাইক্রোসার্জারির মাধ্যমে কানের পর্দা জোড়া লাগাতে হবে যা এখন বাংলাদেশে নিয়মিত করা হয়।
- সাধারণত কানের পর্দা ছিঁড়ে গেলে যেকোন ফার্মেসী থেকে কানের ড্রপ নিয়ে অনেকেই তা ব্যবহার করে যা একেবারেই উচিত না। এক্ষেত্রে কানে কিছুই ব্যবহার করা যাবে না এবং নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে বা নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
কানের খইল সম্পর্কে জানুন
বাইরের বাতাস কানে প্রবেশ করে এবং এই বাতাসের সঙ্গে ধূলা-ময়লা-জীবাণুসহ
আরো নানা জিনিস কানে প্রবেশ করে। এ সব জিনিস যেনো কানের কোনো ক্ষতি করতে না
পারে, সে জন্য কানে তেল জাতীয় এক রকম পদার্থের নিঃসরণ ঘটে। এই পদার্থের
নিঃসরণ ঘটে কর্ণ-নালীর ত্বকের ক্ষুদ্র এক জাতীয় গ্লান্ড থেখে। দেহে এ জাতীয়
গ্লান্ড বা গ্রন্থি আরো আছে। আমাদের দেহে যে ঘাম বের হয় তাও একটি গ্লান্ড
থেকে উৎপন্ন হয়। কানের এই তেল জাতীয় পর্দাথের সঙ্গে বাইরের ময়লা মিশে যে
জিনিসের তৈরি হয় তাকে কানের খইল বলা হয়। অর্থাৎ এ ভাবেই বাইরের ময়লাকে কান
আটকে দেয়।
কানের খইলের ইংরেজি নাম এয়ার ওয়াক্স। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা একে সিরোমেন
বলেন। কানের খইল সাধারণভাবে দুই ধরনের হয়, একটি হলো ভেজা আরেকটি হলো শুকনা।
৮০ শতাংশ মানুষেরই কানের খইল ভেজা থাকে এবং মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের কানে
শুকনা খইল থাকে।শুধু মানুষ নয় আরো অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর কানেও খইল জমতে
দেখা যায়।
হলি ফ্যামিলির নাক কান গলা বিভাগের প্রফেসর ড.এস এম খোরশেদ আলম বলেন
“আমাদের সবার কানে ময়লা জন্মে।অঞ্চল ভেদে এই ময়লাকে নানা নামে অভিহিত করা
হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি ব্যবহার হয় তা হলো কানের খইল।”
আমরা অনেক সময় লঞ্চ ঘাট,ফেরি,বা বাস-রেল স্টেশনে কান পরিষ্কার করছে, এমন
পেশার লোক দেখতে পাই। তাদের হাতে থাকে ছোট একটা বাক্স। তাতে নানা জাতীয়
রংগিন পর্দাথ থাকে এবং বিচিত্র আওয়াজ করে তার সম্ভাব্য খদ্দেরদের দৃষ্টি
আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। পরে খদ্দের পেলে তাদের কান থেকে ময়লা বের করেন।
প্রফেসর ড.এস এম খোরশেদ আলম বলেন, “কানের ময়লা সাফ করার কোনই প্রয়োজন
নেই। কানের ময়লা আপনা থেকেই বের হয়ে যায়। কানের ময়লা ধীরে ধীরে কর্ণ গহবর
থেকে এগিয়ে আসে। তারপর তা ঝরে পড়ে যায়।”
এমনটা কেনো হয় তার ব্যাখ্যা দিতে যেয়ে তিনি বলেন, “আমাদের চোয়ালের হাড়ের
সঙ্গে কানের সংযোগ রয়েছে। ফলে খাদ্য চিবানো বা নানা কারণে যখনই আমরা কাণ
নাড়াচাড়া করি তখনই কানের ভেতরে নাড়া পড়ে এবং জমে থাকা ময়লা ধীরে ধীরে
বাইরের দিকে আসতে শুরু করে। একই সঙ্গে কর্ণ-কোষ বৃদ্ধি পায় এবং ময়লাকে
বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। সব মিলিয়ে কান পরিষ্কার করার কোনো দরকার পড়ে না। বরং
কান পরিষ্কার না করলেও তা সবচেয়ে বেশি পরিষ্কার থাকে। অন্যদিকে কান
পরিষ্কার করা হলে কানে ফোঁড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া কান পরিষ্কার করার
সময় ময়লাকে আরো ভেতরে ঠেলে দেয়া হতে পারে। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। অথবা
পরিষ্কার করতে গিয়ে কানের পর্দায় খোচা লাগতে পারে বা কানের ভেতরের ত্বক
ছিড়ে যেতে পারে, যা বিপদের কারণ হয়ে দেখা দেবে। তবে কান পরিষ্কার করার
প্রয়োজন না থাকলেও কানে তেল, সরিষা নারিকেল বা অলিভ তেল দেয়া যেতে পারে। এ
সব তেল কানের ময়লা বের করতে সাহায্য করে।” যাদের কানের খইল শুকনো, তারা যদি
অলিভ ওয়েল বা অন্য কোনো তেল কানে দেন, তবে তাতে উপকার পাবেন।
প্রফেসর খোরশেদ বলেন “কানে পানি ঢুকলে তেমন কোনো সমস্যা হয় না। তা বের
করারও কোনো প্রয়োজন নেই। দেহের অন্য কোনো স্থানের চেয়ে কানে উষ্ণতা বেশি।
কাজেই যদি কোনোভাবে পানি কানে প্রবেশ করে তবে তা কান থেকে বাষ্প হয়ে বের
হয়ে যাবে। কানে পানি ঢুকলেও তা থাকতে পারে না। এ ছাড়া বাচ্চাদের কানে ময়লা
জমে ব্যথা হয় বলে অনেকে বলে থাকেন। এমন কথাও সাধারণত সত্য নয়। বাচ্চাদের
কানে ব্যথা হয় ভিন্ন কোনো কারণে। তবে কোনো কোনো সময় ময়লা জনিত কারণে কানে
ব্যথা হতে পারে। তবে সে জন্য ময়লা পরিষ্কার করতে হলে তা করতে হবে একজন নাক
কান গলার বিষেশজ্ঞ চিকিৎসককে। একই ভাবে কোনো কোনো সময় কানের ময়লা অনেকের
জন্য সংকটের সৃষ্টি করে। সে ক্ষেত্রে কানের ময়লা বা খইল সরানোর প্রয়োজন হয়ে
পড়ে। এ কাজটিও চিকিৎসক ছাড়া আর কারো করা ঠিক হবে না।”
তিনি আরো বলেন, “যে ময়লা নিজে নিজেই কানের ভেতর থেকে পুনরায় কানের মুখ
পর্যন্ত চলে এসেছে তাকে ফেলতে গিয়ে কেনো আবার ভেতরের দিকে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি
নেয়া ঠিক নয়। তার চেয়ে তাকে আপনা আপনি পড়ে যাওয়ার সুযোগটি দেয়া উচিত।
কানের পরিচর্যা কিভাবে করবেন
প্রাত্যহিক জীবনে আমরা দেহের বিভিন্ন অঙ্গের যত্ন নিয়ে এমন কিছু করি যা
মনগড়া এবং বিজ্ঞানসম্মত নয়। এর ফলে ভয়ানক ক্ষতিসহ সেই অঙ্গহানি হতে
পারে। কানের পরিচর্যার ব্যাপারেও আমাদের রয়েছে কিছু ভ্রান্ত ধারণা,
সেগুলোর বাস্তবসম্মত তথ্য তুলে দেয়ার উদ্দেশ্যেই এ প্রতিবেদন। কানে ব্যথা
হলে গরম তেল বা রসুন দেয়া কি ঠিক। কোনও অবস্থাতেই কানে গরম কোন কিছু বা
বিভিন্ন বনাজি যেমন রসুন দেয়া একেবারেই ঠিক নয়। যদি কানে ইনফেকশন থাকে
তবে এসব দ্রব্যাদি প্রয়োগে কানের পর্দার ক্ষতি হতে পারে কিংবা ইনফেকশনের
মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। কানব্যথার কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ
নেয়া ভালো। সাধারণত কানে খৈল জমলে বা ভাইরাস ইনফেকশন বা সর্দি-জ্বরের পর
কানে প্রদাহ থেকে কানব্যথা হতে পারে। অনেক অভিভাবক শিশুকে সুপাইন বা
শোয়ানো অবস্থায় দুধ বা অন্য কোনও শক্ত খাবার খাইয়ে থাকেন। এতে শিশুর কান
পাকার সম্ভাবনা থাকে, যা আমাদের দেশের শিশুদের প্রায়ই হয়ে থাকে। শিশুদের
কান ও নাকের সংযোগকারী নালী বা ইউস্টেশিয়ান টিউব মোটা ও সমান্তরাল থাকে।
পক্ষান্তরে শ্রুতিনালীও চওড়া ও সমান্তরাল থাকে বলে দুধ বা অন্য খাবার এ
নালী দিয়ে মধ্যকর্ণে প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাচ্চাকে
সবসময় মাথা উঁচু করে বা বসিয়ে খাওয়ানো উচিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া
কানে এন্টিবায়োটিক ড্রপ দেয়া ঠিক নয়। যদি বিভিন্ন ইনফেকশন বা পুঁজ বা
সোয়াব জমে থাকার কারণে এন্টিবায়োটিক ড্রপস দিতে হয় তবে প্রথমেই পরিষ্কার
কটন বাড দিয়ে কানের ভেতরটা আলতো করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এতে জমে থাকা
পানি বা পুঁজ পরিষ্কার হয়ে আসবে, না হলে ড্রপ কানের ভেতরে প্রবেশ না করে
এগুলোর ওপর ভাসতে থাকবে। তারপর যে কানে ড্রপ দিতে হবে তার উল্টোদিকের কানটা
বালিশে মাথা রেখে শুয়ে থাকতে হবে অন্তত ১০ মিনিট। নির্দেশিত পরিমাণ ড্রপ
দেয়ার পর কানের ট্রাগাসে (কানের সামনের গুটলির মতো অংশ) চাপ দিতে হবে।
ড্রপ দেয়ার পর কান অযথা খোঁচাখুঁচি করবেন না, এতে কানের নালীতে আঘাত লাগতে
পারে। রাস্তাঘাটে কোয়াক দিয়ে কান পরিষ্কার করানো কি ঠিক অদক্ষ হাতে বা
অপরিষ্কার কোনও কিছু যদি কানে প্রবেশ করানো হয়,তবে কানে প্রদাহ হতে পারে।
কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে, এমনকি এভাবে খোঁচাখুঁচির ফলে কানে স্থায়ী
বধিরতাও হতে পারে। কানে ময়লা বা খৈল পরিষ্কার করার সাধারণত প্রয়োজন পড়ে
না,তা এমনিতেই বেরিয়ে আসে।যদি কারও খৈল জমে শক্ত হয়ে যায় এবং এর ফলে
কানব্যথা বা কানে শুনতে সমস্যা হয় তবে খৈল বের করার প্রয়োজন হয়। কানে
খৈল বা ময়লা বের করবেন কিভাবে এজন্য সবচেয়ে উত্তম জিনিস হল অলিভ ওয়েল।
পরপর কয়েকদিন দিলে এ খৈল নরম হয়ে বেরিয়ে আসে।অনেকে শক্ত খৈল বের করার
জন্য বিভিন্ন করোসিভ বা রাসায়নিক দ্রব্যের সাহায্য নেন। যেমন- সোডি বাই
কার্ব, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, পার ক্লোরাইড অব মার্কারি ইত্যাদি।এগুলো
বেশি পরিমাণে বা বেশি ঘনত্বে দিলে কানের পর্দায় প্রদাহ হয়ে ফুটো হয়ে
যেতে পারে কিংবা কানে আঘাত লেগে শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে। তাই এ
দ্রব্যাদি ব্যবহারের আগে নাক, কান, গলা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। খৈল জমাট
বেঁধে কান বন্ধ করে দিলে কেবল তখনই তা বের করে আনার প্রশ্ন আসে। আমাদের
পঞ্চইন্দ্রিয়েরকোথাও প্রহার করা উচিত নয়। যদি মারতেই হয় তবে পিঠে চাপড়
দেয়া যায়। তবে কখনই এভাবে শাসন কাম্য নয়।
কানে মারলে পর্দা ফেটে যেতে পারে এবং বধিরতার সৃষ্টি হতে পারে। যার কানের
পর্দা ঠিক আছে তার কানে পানি ঢুকলে কান পাকার সম্ভাবনা নেই। যার কানে
ইনফেকশন আছে, তার যদি কানে পানি ঢুকে তবে এর মাত্রা বেড়ে যাবে। বেশিরভাগ
ক্ষেত্রে কান পেকে থাকে সাধারণত সর্দি-জ্বরের পর বা হাম থেকে কানের পর্দা
ফুটো হয়ে গেলে। কানে বাইরের কোনও বস্তু ঢুকলে কি কান খোঁচাখুঁচি করা ভালো
ছোলার বিচি বা এ ধরনের হাইগ্রোস্কোপিক কোন বস্তু ঢুকলে কানে পানি দেয়া ঠিক
নয়। এতে এ বস্তু ফুলে কানে আটকে যেতে পারে। জীবন্ত কিছু ঢুকলে যেমন-
পিঁপড়া, মশা, ছোট তেলাপোকা বা কোন পোকামাকড়, সেক্ষেত্রে তেল দেয়া যায়।
এর ফলে এসব জীব সাফোকেট হয়ে মরে যায়। যদি তেল না থাকে তবে সিরিঞ্জিং বা
পানি দেয়া যায়। এখানে ড্রপ দেয়ার কোনই দরকার নেই। সাধারণত পর্দা
স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মেই জোড়া লেগে যায়। ড্রপ দিলে হিলিং বা জোড়া
লাগার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কানে ইনফেকশন থাকলে কি সব ঔষধ খাওয়া
যায় কারও কানে ইনফেকশন থাকলে, যদি তার অন্য কোনও ঔষধ ব্যবহার করতে হয় তবে
ডাক্তারের কাছে জেনে নিতে হবে এ ঔষধ কানে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া করে কিনা।
একে অটোটক্সিসিটি বলে।
কান পঁচা
লক্ষণ ও উপসর্গ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে:
১. কান ব্যথা - বিরক্তিকর, একঘেয়ে অবিরাম ব্যথা, কিংবা হঠাৎ করে তীব্র ব্যথা।
২. অস্পষ্ট শ্রবণ;
৩. মাঝে মধ্যে আরও উপসর্গ থাকে:
একশ বা তার চেয়েও বেশি জ্বর, সম্ভবত কাপন দিয়ে;
৪. কানে পরিপূর্ণ বা থ্যালথ্যালে অনুভব করা;
৫. কান দিয়ে রক্ত বা পূজ নিসৃত হওয়া;
৬. গলা ফুলে ওঠা;
৭. নাক দিয়ে পানি পড়া।
শিশুদের ক্ষেত্রে, বিশেষত যেসব শিশুরা এখনও ঠিক মতো কথা বলতে শেখেনি, তাদের ক্ষেত্রে:
- ১. কান সজোরে টানা-টানি;
- ২. খাবারের প্রতি অনীহা;
- ৩. অল্পতেই বিরক্তির উদ্রেক;
- ৪. একশ ডিগ্রী বা তারও অধিক জ্বর;
- ৫. কান বা নাক থেকে তরলের নিসৃতি।
কী করা উচিত
১. লবন গুলানো পানি দিয়ে গলা গারগল করিয়ে গলার স্ফিতি কমানো এবং একই সাথে কানের বদ্ধতা অপসারণ।
২. কানে তুলা বা নরম কাপড় চেপে ধরে থাকা;
৩. গরম পানি থেকে উদ্ভূত বাস্পের মাঝে শ্বাস নেয়া;
৪. ঘুমাবার সময় বালিশ উঁচু করে নেয়া, যাতে করে মাথা উপরে থাকে। এটা কানের মধ্যভাগ থেকে তরল পদার্থ অপসারণে সাহায্য করে;
৫. কেউ কেউ অবশ্য বদ্ধতানিবারক ভেষজ দ্রব্য সেবন করে কানের এই বদ্ধতাকে
অপসারণ করে থাকেন, কিংবা নাসারন্ধেন্সর স্প্রেও একই ভূমিকা রাখতে পারে। এই
স্প্রে যদি একাধিক দিন ব্যবহার করা হয় সেক্ষেত্রে বদ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে তুলে
আপনার অবস্থা আরও খারাপ করে তোলার হুমকী দেখা দিতে পারে;
৬. কিছু ঔষধ, যেমন এ্যাসপিরিন, ইবুপ্রফেন কিংবা এসিটামিনোফেন হয়তো কিছুটা
আরাম দিতে পারে। (তবে ১২ বছর বয়সের নিচে কোন শিশুর যদি চিকেন পক্স,
ইনফ্লুয়েঞ্জা, কিংবা অন্যান্য কোন রোগ রয়েছে, এবং সেটা ভাইরাস বাহিত বলে
আপনি মনে করেন সেক্ষেত্রে তাকে কোনভাবেই এ্যাসপিরিন দেবেন না)।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
১. যদি আপনার বা আপনার শিশুর কানের ব্যথা দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয়।
২. আপনার শিশুর যদি কানে ঘা বা এরকম কোন রোগের উপসর্গ দেখা যায়, কিংবা শ্রবণে সমস্যা দেখা যায়।
৩. আপনার কিংবা আপনার শিশুর শরীরের তাপমাত্রা যদি একশ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডের থেকে বেড়ে যায়।
৪. আপনি বা আপনার শিশুর যদি প্রায়ই কানের রোগে আক্রান্ত হবার প্রবণতা দেখা যায়।
কীভাবে প্রতিরোধ করবেন
১. আপনার ঘর-বাড়ি থেকে এ্যালার্জি সৃষ্টিতে সহায়ক বস্তুগুলোকে সরিয়ে ফেলুন, যেমন: ধুলো, পরিস্কার করার ফ্লুইড, তামাক জাতীয় দ্রব্য।
২. আপনি কিংবা আপনার শিশুটি যদি খাবারের প্রতি এল্যার্জিগ্রস্ত হয়
সেক্ষেত্রে, গমের তৈরি খাদ্য সামগ্রী, ভুট্টার তৈরি খাদ্য সামগ্রী এবং
অন্যান্য বিশেষ কিছু খাবার যেগুলো এল্যার্জির জন্ম দেয় সেগুলো খাদ্য তালিকা
থেকে মুছে ফেলুন।
৩. আপনার শিশুর স্বাস্থের প্রতি যন্তশীল হন, বিশেষত যদি আপনি তাকে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত রেখে থাকেন সেক্ষেত্রে।
৪. যেসব বাচ্চারা বোতলে করে আহার করে তাদের মধ্যে কানের রোগে আক্রান্ত
হবার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। আপনার শিশুটিকে বোতলে করে খাওয়াবার সময় তাকে
সোজাভাবে বসিয়ে রাখুন যাতে করে বোতলের দুধ তার নাকে বা কানে গড়িয়ে যেতে না
পাড়ে।
তথ্য সূত্রঃ ইন্টারনেট




