আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন একটি রাজনৈতিক জোটের
আত্মপ্রকাশ ঘটাতে যাচ্ছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতীয় প্রেস ক্লাবে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ৫৭ দলের এই
‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’-এর ঘোষণা দেবেন তিনি।
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী মনির নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়
জোট (বিএনএ) ও জাতীয় ইসলামী মহাজোট এতে থাকছে। এ ছাড়া ইসলামী ফ্রন্ট
বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিসসহ আরো কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল এতে
যোগ দিতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার
কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে আবারও ক্ষমতায়
যাওয়া। ক্ষমতায় থাকাকালে এরশাদ যে উন্নয়ন করেছেন গত সরকারগুলো তা অতিক্রম
করতে পারেনি। সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য জাতীয় পার্টির বিকল্প নেই। ’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংখ্যার বিচারে অনেক দল নিয়ে এরশাদ
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিকল্প একটি জোট গঠন করতে চললেও এর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন
আছে। কারণ এখনো তিনি সরকারে আছেন। যদি তিনি সত্যিই আগামীতে ক্ষমতায় আসতে
চান তাহলে তাঁকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ নেই।
জানতে চাইলে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন সংগঠন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব
মাওলানা ইউনুছ আহমাদ বলেন, ‘এরশাদ সাহেব একসময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর বয়স
হয়েছে। চারপাশের লোকজন তাঁকে সঠিক পরামর্শ দিচ্ছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ
রয়েছে। এ জন্য তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। এই নতুন জোটের সফলতা নিয়ে
প্রশ্ন আছে। ’
এরশাদের জোটে যোগ দেওয়া একমাত্র নিবন্ধিত দল ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব এম
এ মতিন বলেন, ‘আশাবাদী বলেই আমরা মোর্চা করছি। দেশ পরিচালনায় বড় দুটি দলই
ব্যর্থ। সেই হিসেবে জাতীয় পার্টির আমলে মানুষ অনেক ভালো ছিল। একদিকে
এরশাদের জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে ইসলামী ফ্রন্টের আছে ইতিবাচক রাজনীতি। দেশের
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ধারণ করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলেই আমরা সফল
হব। ’
জানা গেছে, এ জোটের কেউ এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ৫৭ দলের
লিয়াজোঁ কমিটি কর্মসূচি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত
নেবে। এই লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করবেন এরশাদের প্রেস
সেক্রেটারি ও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায়। কমিটিতে শরিক দলগুলোর
মহাসচিবরা থাকবেন সদস্য হিসেবে। নতুন জোটের চেয়ারম্যান হচ্ছেন এইচ এম
এরশাদ। আর মুখপাত্রের দায়িত্বে থাকবেন রুহুল আমিন হাওলাদার। গত শুক্রবার
জাতীয় পার্টির মহাসচিবের গুলশানের বাসায় বসা সভা থেকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান আল্লামা এম এ
মান্নান, বিএনএ চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী মনি, জাতীয় ইসলামী মহাজোটের
চেয়ারম্যান মাওলানা আবু নাসের ওয়াহেদ ফারুক, জোটের প্রধান সমন্বয়ক সুনীল
শুভ রায় প্রমুখ।
জোটের সহ-সমন্বয়কারী এস এম মুশফিকুর রহমান জানান, ওই বৈঠকে দুই জোট ও
দুই দল নিয়ে এরশাদের নেতৃত্বে সম্মিলিত জাতীয় জোট গঠনের চুক্তিপত্র সই
হয়েছে। জাতীয় পার্টি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা
এমপি বলেন, ‘দেশে জোটের রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ আছে। কোন দলের
কত ভোট আছে সেটি মূল কথা নয়, দেশের মানুষ দেখতে চায় এরশাদের সঙ্গে কয়টি দল
আছে। ২০ ও ১৪ দলীয় জোটের বেশির ভাগ শরিক দলের জনভিত্তি নেই। তার পরও শেখ
হাসিনা ও খালেদা জিয়া জোটের রাজনীতিকে গুরুত্ব দেন। ’
কেন এরশাদের নতুন জোট : জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যেকোনো মূল্যে আরেকবার
ক্ষমতায় যেতে চান সাবেক এই সেনাপ্রধান। আর যদি তা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে
তিনি ক্ষমতার ভাগ কিংবা আমৃত্যু রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে চান। আর
এসব চিন্তা থেকেই দেশি-বিদেশি বন্ধুদের পরামর্শে তাঁর এই উদ্যোগ। তা ছাড়া
আগামী নির্বাচনে কোনো কারণে যদি বিএনপি না আসে তখন বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার
সুযোগ থাকবে। এ কারণে তিনি জোট গঠন করছেন বলে জানিয়েছেন এরশাদের ঘনিষ্ঠরা।
এ জোটে জাপা ছাড়া বাকি সব দলই নাম ও প্যাড সর্বস্ব। বেশির ভাগই সম্প্রতি
গড়ে ওঠা। তাদের অফিস নেই, নেই তেমন নেতাকর্মীও। দলগুলোর কোনোটিই কখনো কোনো
জোটের হয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আর নিবন্ধন না থাকায় নামসর্বস্ব
দলগুলো এককভাবে কখনো জাতীয় নির্বাচন করার সুযোগও পায়নি। এর পরও জাতীয়
পার্টি ও শরিক দলগুলোর নেতারা এ জোট নিয়ে আশাবাদী।
জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম ফয়সল চিশতী
এ বিষয়ে বলেন, ‘দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে জনপ্রিয়তার তুলনায়
দুই নেত্রী পিছিয়ে। জেল থেকে দু-দুবার পাঁচ আসনে জেতার ইতিহাস আছে একমাত্র
তাঁর। ’
নাজমুল হুদার নেতৃত্ব ছেড়ে জাপায় বিএনএ : ২১টি রাজনৈতিক দলের জোট বিএনএর
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে সে
সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তেমন কোনো সুবিধা না পাওয়ার আশঙ্কায়। বরং জাতীয়
পার্টির সঙ্গে থাকাটা বেশি লাভজনক হবে বলে মূল্যায়ন তাদের। গত ৫ এপ্রিল
বিএনএর এক জরুরি সভায় নিষ্ক্রিয়তা ও সিদ্ধান্তহীনতার অভিযোগে জোটের
চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার করা হয়। নতুন চেয়ারম্যান হন
সেকান্দার আলী মনি এবং সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর হোসেন। এরপর জাতীয় পার্টির
নেতৃত্বে নতুন জোট গঠনের ঘোষণা দেয় বিএনএ।
বিএনএর একটি সূত্র জানায়, নাজমুল হুদাকে বিশ্বাস করতে পারেনি আওয়ামী
লীগ। তাই সরকারের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকায় নেতারা চিন্তিত
হয়ে পড়েন জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ চায় জাতীয় পার্টি একটি
শক্তিশালী বিরোধী দল হোক। এসব বিবেচনায় জাতীয় পার্টির সঙ্গেই জোট করার
সিদ্ধান্ত হয়।
বিএনএ জোটের দলগুলো হলো, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, গণতান্ত্রিক ন্যাশনাল
আওয়ামী পার্টি, আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক আন্দোলন,
ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি, আমজনতা পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি, ইউনাইটেড
মুসলিম লীগ, গণ-অধিকার পার্টি, বাংলাদেশ প্রতিবাদী জনতা পার্টি, বাংলাদেশ
গণজাগরণ পার্টি, বাংলাদেশ গ্রামীণ পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক গণতান্ত্রিক
লীগ, তৃণমূল লীগ, জাতীয় হিন্দু লীগ, বাংলাদেশ পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি
ইত্যাদি।
ইসলামী মহাজোটের যারা : গত ১ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এরশাদের
উপস্থিতিতে ৩৪টি দল নিয়ে জাতীয় ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করা হয়। এ জোটের শরিকরা
হলো ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, গণ-ইসলামিক জোট, পিপলস জাস্টিস পার্টি, জাতীয়
গণতান্ত্রিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ ইসলামিক লিবারেল পার্টি, জাতীয় শরিয়া
আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, বাংলাদেশ জনতা পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী
জনকল্যাণ পার্টি, ইউনাইটেড ইসলামিক লীগ, জমিয়তে মুসলিমিন বাংলাদেশ,
ন্যাপ-ভাসানী, খেলাফত সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ মানবাধিকার পার্টি, ইসলামী
গণ-আন্দোলন, জাতীয় ইসলামী আন্দোলন, জমিয়তুল ওলামা পার্টি, জাতীয় ইসলামিক
মুভমেন্ট, খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ, ইনসানিয়াত পার্টি, খেলাফত বাস্তবায়ন
পার্টি, ইসলামী আক্বিদা সংরক্ষণ পার্টি, ইসলামী সংরক্ষণ পার্টি, মুসলিম
জনতা পার্টি, খেদমতে খালক পার্টি, ওলামা-মাশায়েখ সমন্বয় পরিষদ, ইউনাইটেড
ইসলামিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ইসলামী পার্টি, ইসলামী সমাজকল্যাণ আন্দোলন,
বাংলাদেশ ইত্তেহাদুল মুসলিমিন, বাংলাদেশ খেলাফাতুল উম্মাহ, বাংলাদেশ
আক্বিমুদ্দিন মজলিস, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও জমিয়তুল হেদায়াহ
মুভমেন্ট।
বিএনপি জোটের যারা থাকতে পারে : কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে ইসলামী
ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল এরশাদের
জোটে যোগ দিতে পারে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক
বলেন, ‘এরশাদের প্রস্তাব পেয়েছি। দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ’
একই কথা বলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ
আমিনও।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী কালের কণ্ঠকে বলেন,
‘দলীয় ফোরামে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনা করেই না তবে জোট। ’
দলের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘রাজনৈতিক জোট গঠনের উপযোগী
পরিবেশ-পরিস্থিতি দরকার। তার কোনোটাই এখন নেই। ’
হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত খেলাফত আন্দোলনের একটি অংশও এরশাদের এ জোটে
আসতে পারে। এর নেতৃত্বে আছেন মাওলানা জাফরুল্লাহ খান। জানতে চাইলে খেলাফত
মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘সাংবাদিকরা আমাদের জিজ্ঞেস না
করেই বলে দিচ্ছেন, আমরা নাকি এরশাদের জোটে যাচ্ছি। খেলাফত মজলিস এখনো
বিএনপির সঙ্গে আছে। ’
জোটকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল : সম্মিলিত জাতীয় জোটের সাফল্য কামনা করে
সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপির নেতৃত্বে গতকাল দুপুরে মিছিল ও সমাবেশ করেছে
শ্যামপুর ও কদমতলী থানা জাতীয় পার্টি।
